বাংলা ভাষার প্রতি আমাদের ভালোবাসা ও ত্যাগের ইতিহাস বহু পুরোনো
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন ছিল মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রীয় ও শিক্ষাব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠা করা।

বাংলা ভাষার প্রতি আমাদের ভালোবাসা ও ত্যাগের ইতিহাস বহু পুরোনো। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন ছিল মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রীয় ও শিক্ষাব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু বাস্তবে আমরা উচ্চশিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে আজও ইংরেজির উপর নির্ভরশীল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়—যেখানে ভাষা আন্দোলনের গোড়াপত্তন হয়েছিল—সেখানেই এখন প্রায় সব গবেষণা, তত্ত্ব ও পাঠ্যক্রম পাশ্চাত্যকেন্দ্রিক।
এ বাস্তবতায় প্রশ্ন জাগে: এত আন্দোলন-সংগ্রাম সত্ত্বেও আমরা কেন মাতৃভাষার মাধ্যমে উচ্চশিক্ষাকে বিকশিত করতে পারলাম না? ঔপনিবেশিক শাসনামলে ইংরেজি ভাষা ছিল প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের মূল হাতিয়ার। স্বাধীনতার পরও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত অগ্রগতির স্বীকৃতি হিসেবে ইংরেজির কদর বেড়েই চলেছে। ফলে আমরা নিজেদের অজান্তেই এক ধরনের “এপিস্টেমিক কলোনাইজেশন”-এর শিকার হয়েছি, যেখানে জ্ঞানচর্চার মৌলিক ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে অন্যের ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর।
বিশ্বায়নের এই যুগে ইংরেজি জানাটা যে একেবারে অপ্রয়োজনীয়, তা নয়—গবেষণা, আন্তর্জাতিক সম্মেলন ও বৈজ্ঞানিক প্রকাশনায় ইংরেজি অপরিহার্য। কিন্তু সমস্যাটা হয় তখন, যখন আমাদের মাতৃভাষা জ্ঞান তৈরির ক্ষেত্র থেকে ক্রমশ দূরে সরে যায়। এর পেছনে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মনোভাবও কাজ করে। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণির বড় একটি অংশ মনে করে, ইংরেজিই উন্নতি ও আভিজাত্যের মাপকাঠি।
বাংলায় বিজ্ঞান, প্রযুক্তি বা উচ্চতর গবেষণার পর্যাপ্ত বইপত্রের অভাব এবং আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে এসব প্রকাশের সুযোগ সীমিত হওয়ায়, অনেকেই বাংলায় জ্ঞানচর্চাকে সময়ের অপচয় মনে করেন। ফলে শ্রেণিগতভাবে যে যত উপরে উঠছেন, তিনি তত বেশি ইংরেজিমুখী হচ্ছেন। এমনকি একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকও যদি গবেষণা বা প্রবন্ধ লিখতে চান, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য ইংরেজিই ভরসা। এতে বাংলা ভাষা গবেষণার মূলধারা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, আর উচ্চবিত্ত মহলে বাংলায় দক্ষ ব্যক্তির সংখ্যাও ক্রমেই কমে আসছে।
এভাবে দীর্ঘমেয়াদে ভাষাটির বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে, যার পরিণতি কতটা গুরুতর হতে পারে তা এখনও স্পষ্ট নয়। অবশ্যই ইংরেজির গ্রহণে কিছু সুবিধা রয়েছে। বৈশ্বিক যোগাযোগের দরজা খুলে যায়, আন্তর্জাতিক মানের স্বীকৃতি মেলে, এবং পৃথিবীর সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তক ও গবেষণা সহজলভ্য হয়। কিন্তু মাতৃভাষা বাংলাকে উপেক্ষা করার ফলেও আমাদের ক্ষতি কম নয়। প্রথমত, নিজস্ব জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি গড়ে উঠছে না; আমরা পাশ্চাত্যের চিন্তা ও তত্ত্বের পুনরুৎপাদনেই ব্যস্ত।
দ্বিতীয়ত, বাংলায় মৌলিক গবেষণা কম হওয়ায় আমাদের শিক্ষার্থীরা মৌলিকভাবে চিন্তা করার সুযোগ পায় না। তৃতীয়ত, গণতন্ত্রের কাঠামো গড়ে তুলতেও আমরা ইউরোপীয় মডেলই অনুসরণ করছি—যার পেছনের সামাজিক, সাংস্কৃতিক বাস্তবতা আমাদের থেকে ভিন্ন। ফলে গণতন্ত্র ও অধিকারের জন্য যত আন্দোলনই হোক, প্রকৃত গণতন্ত্রের মর্মকাঠামো এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। উপরন্তু, উচ্চশিক্ষায় ইংরেজির প্রাধান্য ভাষাগত বৈষম্য সৃষ্টি করে, কারণ সকল শিক্ষার্থী বা নাগরিক তো আর সমান দক্ষতায় ইংরেজি জানেন না। তাহলে সমাধান কী?
একতরফাভাবে ইংরেজি বর্জন করা সম্ভব নয়, আবার মাতৃভাষাকে এভাবে পেছনে ফেলে রাখাও মঙ্গলজনক নয়। তাই একটি দ্বিভাষিক কাঠামো গড়ে তোলা যেতে পারে—যেখানে আন্তর্জাতিক গবেষণা ও প্রকাশনার জন্য ইংরেজিকে ব্যবহার করা হবে, পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ শিক্ষাদান ও জ্ঞান সৃষ্টির ক্ষেত্রে বাংলাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। রাষ্ট্র ও শিক্ষা-ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করতে হবে, যেন বাংলায় উচ্চশিক্ষার জন্য মানসম্পন্ন পাঠ্যপুস্তক ও গবেষণাপত্র প্রকাশের পরিমাণ বাড়ে।
প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত এমন এক ভারসাম্যপূর্ণ পাঠ্যক্রম দরকার, যেখানে বাংলা ও ইংরেজি—উভয় ভাষায়ই দক্ষতা অর্জন করা সম্ভব হয়। একই সঙ্গে দেশে-বিদেশে থাকা বাঙালি গবেষক ও অধ্যাপকদের নিয়ে অনলাইন ও অফলাইনে একটি জ্ঞানভিত্তিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা যেতে পারে, যেখানে বাংলা ভাষায় গবেষণা-প্রবন্ধ, নিবন্ধ ও বই প্রকাশের সুযোগ আরও প্রসারিত হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমরা আমাদের ভাষায় আমাদের মূল্যবোধ, ন্যায়-অন্যায়, সুবিচার ও নৈতিকতার তাত্ত্বিক ভিত্তি গড়ে তুলতে পারিনি বলেই গণতান্ত্রিক কাঠামো বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। যে ইউরোপীয় গণতন্ত্রের মডেল আমরা অনুসরণ করি, তার সামাজিক শিকড় ভিন্ন। আমাদের সাংস্কৃতিক শিকড়কে বিবেচনায় নিয়ে গণতন্ত্রের ধারণা পুনর্গঠন করতে পারলে হয়তো রাজনৈতিক কাঠামোতে স্থায়িত্ব আসবে। আর এর জন্য মাতৃভাষায় জ্ঞানচর্চা, চিন্তাভাবনা ও গবেষণার বিকল্প নেই।
উচ্চশিক্ষায় বাংলার ব্যবহার কেবল ভাষাগত মর্যাদার প্রশ্ন নয়; এটি জ্ঞান-উৎপাদন, সাংস্কৃতিক বিকাশ ও নিজস্ব গণতান্ত্রিক কাঠামোকে টেকসই করার সাথেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ১৯৫২ সাল থেকে আমরা অনেক আন্দোলন দেখেছি, কিন্তু প্রকৃত স্বাধীনতা তখনই আসবে, যখন আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে আমরা আমাদের চিন্তা ও ব্যবস্থাকে গড়ে তুলতে পারব।
ইংরেজি-সহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক ভাষা অবশ্যই শিখতে হবে, তবে মাতৃভাষাকে কেন্দ্র করে মৌলিক চিন্তা ও গবেষণার ধারা তৈরি করতে পারলেই আমরা সত্যিকারের জ্ঞানসমৃদ্ধ ও আত্মনির্ভরশীল জাতিতে পরিণত হব। সেই লক্ষ্যে এখন থেকেই আমাদের সোচ্চার হওয়া জরুরি।
এই খবর প্রথম প্রকাশ হয়েছিল প্রান্তিক নিউজের ফেসবুক পাতায়।

