প্রান্তিক নিউজের পাশে, সত্য খবরের সাথে থাকুন।সত্যের সাথে থাকুন।

সহায়তা করুন

শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬
২২ কার্তিক ১৪৩৩

কক্সবাজারে বিমান বাহিনীর গুলিতে নিহত শিহাব কবির নাহিদ (৩০) এর পরিবারে শোকের মাতম

হঠাৎ একটি গুলি মাথায় এসে লাগে।

কক্সবাজারে বিমান বাহিনীর গুলিতে নিহত শিহাব কবির নাহিদ (৩০) এর পরিবারে শোকের মাতম

কক্সবাজারে বিমান বাহিনীর গুলিতে নিহত শিহাব কবির নাহিদ (৩০) এর মা আমেনা খাতুন বলেন,'ইটপাটকেল নিক্ষেপের সময় ছেলে (শিহাব) ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। হঠাৎ একটি গুলি মাথায় এসে লাগে। গুলিতে মাথার খুলি উপড়ে মগজ বেরিয়ে আসে। দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।' নিহত শিহাবের বাবা নাছির উদ্দিন কক্সবাজার পিটিআইয়ের সাবেক সুপার। মা আমেনা খাতুন কক্সবাজার সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের পদ থেকে কয়েক বছর আগে অবসর গ্রহণ করেন। থাকেন সমিতিপাড়ায়।

স্থানীয়রা জানায়, কক্সবাজারের ঘাঁটি সম্প্রসারণ করতে সেখানকার বাসিন্দাদের উচ্ছেদ করার পাঁয়তারা করছিল বেশ কয়েক বছর ধরে। ফলে বাসিন্দারা ভিটেবাড়ি হারানোর ভয়ে উদ্বিগ্ন দিন কাটাচ্ছিল। তারা অনেক বছর ধরে সরকারের কাছে আবেদন নিবেদন করেও খাস জমিতে গড়ে তোলা তাদের ভিটেবাড়ি বন্দোবস্ত পায়নি। পায়নি বিকল্প ভিটেবাড়ির প্রস্তাবও। সর্বশেষ কয়েক মাস ধরে তাদের উচ্ছেদ প্রক্রিয়া তীব্র হয়। দিশেহারা বাসিন্দারা জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে ফাইল চাপা পড়া তাদের আবেদনটি পুনর্বিবেচনার দাবি তোলে।

এর মধ্যে বিমান বাহিনীর লোকজন দুই পাড়ার বাসিন্দাদের নানা ধরনের হুমকি ধামকি দিয়ে যাচ্ছিলো। স্থানীয় বাসিন্দা জাহিদ আজ সকালে কয়েকজন তরুণকে জড়ো করে জেলা প্রশাসক বরাবরে একটি স্মারকলিপি দেওয়ার জন্য শহরের উদ্দেশে যাত্রা করছিলেন। পথিমধ্যে তাদের কয়েকজনকে আটকে দেয় বিমান বাহিনীর সদস্যরা। জাহেদকে ঘাঁটিতে বেঁধে রেখে নির্মম নির্যাতন করে। হুমকি দেয়-- তার মতো কয়েকটা জাহেদ নাই করে দিলে কেউ কিচ্ছুটি করতে পারবে না। এই খবর ইতোমধ্যে চাউর হয়ে যায় সমিতি ও কুতুবদিয়া পাড়ায়।

ক্ষুব্ধ বাসিন্দারা জড়ো হয় বিমান বাহিনীর ঘাঁটির সামনে। তারা জাহেদকে ছেড়ে দিতে বলে। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে প্রথমে বাকবিতন্ডা ও ধাক্কাধাক্কি হয় এবং পরে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। এ সময় বিমান বাহিনীর লোকজন বিক্ষুব্ধ জনতার ওপর গুলি চালায়। শিহাবের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় লোকজন লাঠিসোঁটা নিয়ে বিমানবাহিনীর ঘাঁটির দিকে আসতে থাকেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায় বিমান বাহিনীর সদস্যরা বিক্ষুব্ধ জনতার দিকে গুলি করছেন।

গুলির বিপরীতে স্থানীয়রা ইট পাটকেল ছুঁড়ছেন। কিন্তু, এই হত্যাকাণ্ডের দায়ভার এড়াতে দুপুরে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) থেকে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিমানবাহিনী ঘাঁটি কক্সবাজারসংলগ্ন সমিতিপাড়ার কিছু দুর্বৃত্ত বিমানবাহিনীর ঘাঁটি ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়েছে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। চিঠিতে স্বাক্ষর করেন আইএসপিআরের সহকারী পরিচালক আয়শা ছিদ্দিকা।

উল্লেখ্য,কক্সবাজার বিমানবন্দরে সমিতিপাড়া, কুতুবদিয়া পাড়াসহ ১৯টি গ্রাম-মহল্লা নিয়ে কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ড। ৭০ হাজার বাসিন্দার ৯০ শতাংশই জলবায়ু উদ্বাস্তু। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের প্রলয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে ঘরবাড়ি হারিয়ে কুতুবদিয়া, পেকুয়া, মহেশখালীসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন এসে ১ নম্বর ওয়ার্ডের খাসজমিতে মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নেন। কয়েক বছর ধরে কিছু এলাকায় বিমান ঘাঁটি নির্মাণ করা হচ্ছে।

এসব জায়গা থেকে উচ্ছেদ হওয়া লোকজনের জন্য তিন কিলোমিটার দূরে খুরুশকুলে ১৩৭টি পাঁচতলা ভবনের বিশেষ আশ্রয়ণ প্রকল্প গড়ে তোলা হচ্ছে। দুই বছর আগে ২০টি ভবনে ৬০০ পরিবারের ঠাঁই হয়েছে। এখন আরও ৮৫টি ভবন প্রস্তুত করা হয়েছে। গত ৭ জানুয়ারি সকালে ১ নম্বর ওয়ার্ডের কয়েক হাজার নারী-পুরুষ শহরের প্রধান সড়ক অবরোধ করে উচ্ছেদ বন্ধের দাবি জানান।

উল্লেখ্য ২৭ ডিসেম্বর ২০১০ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানিয়েছিলেন যে দেশের সমুদ্রসীমা ও শহরের সামরিক স্থাপনা রক্ষার জন্য সরকার শীঘ্রই কক্সবাজারে একটি বিমানঘাঁটি নির্মাণ শুরু করবে। ৩ এপ্রিল ২০১১ হাসিনা বিমানঘাঁটি উদ্বোধন করেন। এবং ১৮ ডিসেম্বর ২০১৯ সালে শেখ হাসিনার নামে পরিবর্তন করে এর নামকরণ করা হয়। এই ঘাঁটি নির্মানের জন্যই ভূমি অধিগ্রহণ নিয়ে স্থানীয়দের সাথে শান্তিপুর্ণ পুনর্বাসনের সমাধান না হওয়ায় এখনো বিমান বাহিনী ও স্থানীয়দের মধ্যে দ্বন্দ্ব রয়ে গেছে।

এই খবর প্রথম প্রকাশ হয়েছিল প্রান্তিক নিউজের ফেসবুক পাতায়।