প্রান্তিক নিউজের পাশে, সত্য খবরের সাথে থাকুন।সত্যের সাথে থাকুন।

সহায়তা করুন

শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬
২২ কার্তিক ১৪৩৩

মুশতাক আহমেদ: আমাদের 'কুমির ভাই'

মুশতাক আহমেদ: আমাদের 'কুমির ভাই'

‘মুশতাক ভাইয়ের ওপর যে কী নির্যাতন হয়েছে!’ কথা শেষ করতে পারেন না, গুমড়ে গুমড়ে কাঁদতে থাকেন কিশোর। অন্য প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলতে গেলেও কিশোর ফিরে আসে মুশতাক প্রসঙ্গে। ‘মুশতাক ভাই বললেন, তুই কিন্তু কাউকে বলবি না যে আমাকে ইলেকট্রিক শক দেওয়া হয়েছে, নির্যাতন করা হয়েছে।’ আবার গুমড়ে কাঁদতে শুরু করেন কিশোর। ‘তোর ভাবি যেন না জানে, আব্বা-আম্মা যেন না জানে। বার বার আমাকে একথা বলেছেন মুশতাক ভাই,’ বলে যেতে থাকেন কিশোর।

কুমির চাষ করতে গিয়ে ২০০৫ সালে পরিচয় হয়েছিল মাসিহা আখতার লিপার সঙ্গে। লিপা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগ থেকে পাস করা প্রাণীবিদ। কুমির চাষি মুশতাক আহমেদের বর্ণাঢ্য জীবন। মুশতাক আহমদের বাবা ছিলেন কেরু অ্যান্ড কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক। ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের ছাত্র ছিলেন মুশতাক। তারপর স্কলারশিপ নিয়ে পড়তে গিয়েছিলেন যুক্তরাজ্যে। চা বাগানে চাকরি করেছেন, ছিলেন ট্যুর গাইড। ঘটনাচক্রে মোস্তফা সরওয়ার ফারুকীর একটি নাটকে ট্যুর গাইডের চরিত্রে অভিনয়ও করেছিলেন।

২০০৫ সালেই বিয়ে করেন মুশতাক-লিপা। কুমির চাষ ও মুশতাকের জীবনের সঙ্গে মিলেমিশে যান লিপা। প্রিয় স্ত্রী লিপাকে নিজের অসম্মানের কথা লেখক মুশতাক আহমেদ জানাতে চাননি। জানাতে চাননি ৮৯ বছরের বাবা আর ৮১ বছরের মাকে! কিশোর বলছিলেন, ‘মুশতাক ভাই মারা যাওয়া আগেও কারাগারে তিন বার এভাবে পড়ে গিয়েছিলেন।’ চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছে কিশোরের। ‘মুশতাক ভাইয়ের মতো ভালো একজন মানুষকে ইলেকট্রিক শক দেওয়া হলো...। কী যে যন্ত্রণা হয়েছে... কাপড় নষ্ট করে ফেলেছেন...।

মুশতাক ভাই শারীরিকভাবে খুব ফিট ছিলেন। ইলেকট্রিক শকই...’ কিশোরের বাক্য শেষ হয় না। ‘হাঁটিয়ে এনে মুশতাক ভাই ও আমাকে মাইক্রোবাসে তোলা হলো। মুশতাক ভাই ঠিকমত হাঁটতে পারছিলেন না। হাঁটতে পারছিলাম না আমিও। নির্যাতনের অজানা স্থান থেকে খিলগাঁও র‌্যাব কার্যালয়ে নিয়ে গেল। মাইক্রোবাস থেকে ঠেলে নামানো হলো। ঠিকমত হাঁটতে পারছি না দুজনই। একবার ঠেলে নামায়, একবার ধাক্কা দিয়ে তোলে। এভাবে উঠানো-নামানো হলো কয়েকবার। যাতে আমরা ঠিকমত হেঁটে র‌্যাব অফিসে ঢুকি, যেন শুটিংয়ের রিহার্সেল।

তখনো আমার কান দিয়ে রক্ত পড়ছিল। রক্তে শার্ট ভিজে গেছে। একজন বলল, “ওর রক্ত তো বন্ধ হয়নি”। একজন বলল, “এই নে পানি খা”। পানি খাওয়ানোর মতো করে কানে-গায়ে পানি ঠেলে দিলো। যেন রক্ত ধুয়ে যায়। খিলগাঁও র‌্যাব কার্যালয় থেকে আনা হলো টিকাটুলি র‌্যাব কার্যালয়ে। সেখানে শুটিংয়ের মতো করে ভিডিও করা হলো। তারপর হস্তান্তর করা হলো রমনা থানায়। সেই ভিডিওগুলো প্রকাশ করলেও বোঝা যাবে তখন আমাদের অবস্থা কেমন ছিল,’ চুপ করে তাকিয়ে থাকেন কিশোর।

যেকোনো কথা বলতে বলতে কিশোরের মুখে চলে আসে লেখক মুশতাকের নাম। দম বন্ধ করা কান্নায় ভেঙে পড়েন। পুরো সময়জুড়ে শরীরী মুশতাকের উপস্থিতি না থাকলেও অশরীরী মুশতাকের উপস্থিত প্রবল। সামনে অসহায় সাংবাদিক। যার কাছে প্রশ্ন আছে, আছে উত্তরও। করার নেই কিছু, কিছুই। . “একটা মানুষ একটা কার্টুন শেয়ার করল। সেটার জন্য ৯ মাস জেলে থাকল, ৬ বার জামিন আবেদন নাকচ হল। কার কাছে কী বিচার চাইবেন আপনি। কে বিচার করবে?”, কথাগুলো বলছিলেন মুশতাক আহমেদের চাচাতো ভাই ডা. নাফিসুর রহমান।

তিনি জানান, মুশতাক ভাইয়ের পরিবারের বিচার চাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন “তারা এখন কারো কাছে আর মুশতাকের মৃত্যুর বিচারও দাবি করতে চান না।” কোভিড-১৯ মহামারীর মধ্যে ২০২০ সালের ৬ মে ঢাকার লালমাটিয়ার বাসা থেকে মুশতাককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বন্দি অবস্থায় গত বছর ২৫ ফেব্রুয়ারি গাজীপুরের কাশিমপুরের হাই সিকিউরিটি কারাগারে নিহত হন ৫৩ বছর বয়সী মুশতাক ভাই। কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোরকেও সে সময় গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।

শেখ হাসিনার কালো আইন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় ‘সরকারবিরোধী প্রচার ও গুজব ছড়ানোর’ অভিযোগ আনা হয় তাদের বিরুদ্ধে। মৃত্যুর আগে নয় মাসে ৬ বার মুশতাকের জামিন আবেদন নাকচ হয় আদালতে। কারাগারে তার মৃত্যু ক্ষোভের জন্ম দেয়, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও ওই ঘটনায় সরব হয়। লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যুর ৩৯ দিনের মাথায় মারা যান তার বাবা আব্দুর রাজ্জাক (৮৯)। ছেলের মৃত্যুশোক সইতে পারেননি তিনি।

ডা. নাফিসুর বলেন, “মুশতাকের বাবা প্রায়ই বলতেন, আমার ছেলে জেলে আছে, কিন্তু আমি প্রাউড ফিল করি যে আমার ছেলে একটা প্রতিবাদ করতে গিয়ে সত্যি কথা বলতে গিয়ে জেলে গেছে। “কিন্তু ছেলের মৃত্যুর পর বিচারের কোনো আশা না পেয়ে তিনি খুবই আঘাত পেয়েছেন। এটা তিনি সহ্য করতে পারেননি।” নাফিসুর বলেন, “ছেলে মারা যাওয়ার পরে মুশতাকের বাবা সারাক্ষণ ফেইসবুকে কে প্রটেস্ট করছে, কী প্রটেস্ট হচ্ছে, শায়ান গান গাচ্ছে, কেউ কবিতা লিখছে… এগুলো নিয়েই উনি সময় কাটাতেন।

কারো সঙ্গে এগুলো নিয়ে কোনো আলোচনা করতেন না। ছোট মেয়ে দেশের বাইরে থেকে এলো, তিনি তার সঙ্গেও এসব নিয়ে একটি কথা বললেন না। আসলে তিনি এই সিস্টেমের ওপর পুরোপুরি বিশ্বাস হারিয়েছিলেন।... মুশতাকের বাবাও বলতেন, তার মাও একই জিনিসই বলছেন… এই দেশে আর বিচার হবে না। বিচার চেয়ে কোনো লাভ নেই, প্রটেস্ট করেও কোনো লাভ নেই। কিছুই হবে না।... তবে যদি আপনি আমাকে জিজ্ঞেস করেন আমি আমার ভাইয়ের মৃত্যুর বিচার চাই কি না না, ওর মা কী চায় কি না, ওর স্ত্রী কী চায় কি না?… অবশ্যই চায়।

কিন্তু সবাই এত ফ্রাস্টেটেড যে সবাই হাল ছেড়ে দিয়েছেন।””” ২০২০ সালের ৬ মে কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোর এবং লেখক মুশতাক আহমেদকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। পরদিন ওই দুজনসহ ১১ জনকে আসামি করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে রমনা থানায় মামলা করেন র‌্যাব-৩ এর ডিএডি আবু বকর সিদ্দিক।

মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে ফেইসবুক ব্যবহার করে জাতির পিতা, মুক্তিযুদ্ধ, করোনাভাইরাস মহামারী সম্পর্কে গুজব, রাষ্ট্র/সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অভিপ্রায়ে অপপ্রচার বা বিভ্রান্তি ছড়ানো, অস্থিরতা-বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পাঁয়তারার অভিযোগ আনা হয়। ফেইসবুকে ‘I am Bangladeshi’ পেইজে সম্পৃক্ত হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয় কিশোর, মুশতাক যে পেইজ থেকে রাষ্ট্রের সুনাম ও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে বিভিন্ন পোস্ট দেওয়া হচ্ছিল বলে তখন অভিযোগ করে র‌্যাব।

মুশতাক ভাইয়েরর মৃত্যুর পর জামিন পান কার্টুনিস্ট কিশোর। পরে তিনি হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগে মামলা করেন। মামলার আর্জিতে বলা হয়, ৫ মে রমনা থানার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের একটি মামলায় কিশোরকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। কিন্তু তারও তিন দিন আগে ২ মে সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে সাধারণ পোশাকের ১৬-১৭ জন লোক কাকরাইলের বাসা থেকে তাকে ‘জোর করে হাতকড়া ও মুখে মুখোশ পরিয়ে অজ্ঞাত এক নির্জন জায়গায়’ নিয়ে যায়। তাকে রাখা হয় একটি পুরানো ও স্যাঁতস্যাঁতে বাড়ির একটি কক্ষে।

সেখান থেকে তিনি বাইরে গাড়ির হর্নের শব্দ পাচ্ছিলেন। ওই ঘরে প্রজেক্টরের মাধ্যমে কিশোরের নিজের আঁকা বিভিন্ন কার্টুন একের পর এক দেখিয়ে সেগুলোর মমার্থ জানতে চাওয়া হয়। করোনাভাইরাস নিয়ে আঁকা কিছু কার্টুন দেখিয়ে জানতে চাওয়া হয়, তিনি সেগুলো কেন এঁকেছেন, কার্টুনের চরিত্রগুলো কারা। কিশোর ভাই বলেছেন, এক পর্যায়ে ‘প্রচণ্ড জোরে থাপ্পর মারা হয়’ তার কানে। তাতে কিছু সময়ের জন্য বোধশক্তিহীন হয়ে পড়েন। তবে তিনি বুঝতে পারছিলেন যে কান দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে।

পরে ‘স্টিলের পাত বসানো লাঠি দিয়ে’ তাকে ‘পেটানো’ হয়। যন্ত্রণা ও ব্যথায় তিনি সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেন। কিশোরের মামলার আবেদন পেয়ে ঢাকার একটি আদালত পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) অভিযোগটি তদন্ত করতে বলে। নভেম্বরে পিবিআই আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করে জানায় যে, কিশোরকে নির্যাতনের কোনো প্রমাণ তারা ‘পায়নি’! মুশতাক আহমেদ ছিলেন চট্টগ্রাম ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের ছাত্র, পরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের। উচ্চশিক্ষার জন্য ইংল্যান্ডেও যান।

কৃষি খামারের প্রতি আগ্রহী হয়ে অনেক দেশে ঘুরে বেড়ান। দেশে সুন্দরবন থেকে শুরু করে আনাচে কানাচে ঘুরেছেন। কুমির পাগল ছিলেন তিনি। শুধু বাংলাদেশেই নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়াতে তিনিই প্রথম কুমির চাষ করা শুরু করেন। মিডিয়ায় পরিচিত হয়েছিলেন 'কুমির ভাই' বলে। তার আগে পরিচিতরা তাকে পাগল ডাকত। দেশ থেকে প্রথম কুমির রপ্তানি করেন এই মুশতাকই৷ তিনি বলেছিলেন, ‘আমি যে পাগল ছিলাম না, তা প্রমাণ করতেই লেগেছে আট বছর।’

দেশের প্রচলিত আইনের মধ্যে থেকে ৬৭টি কুমির রপ্তানির মাধ্যমে পরে মানুষ বিশ্বাস করতে বাধ্য হন যে তিনি পাগল ছিলেন না। অথচ কুমির চাষের অনুমতি পেতে দুই বছরে ৩২টি টেবিল ঘুরে আসতে হয়েছিল তাকে। শুনতে হয়েছিল, দেশের বাইরে টাকা পাচারের ধান্ধা এসব। বুঝেন এবার, বিদেশে টাকা পাচার রোধে কী কঠোর 'উনারা'! কুমির চাষে নামার আগে সুন্দরবন এলাকায় ঘুরতে ঘুরতে পরিচয় হয়েছিল মাসিহা আখতার লিপার সাথে, তাকেই বিয়ে করেছিলেন তিনি।

লিপা ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিজ্ঞানের ছাত্রী, গবেষণা করেছিলেন মুক্তা চাষ ও ইলিশ নিয়ে। রীতিমতো 'কুমির চাষের এনসাইক্লোপিডিয়া' ছিলেন তিনি। এ জন্যই হয়ত আরেক কুমির পাগল মুশতাকের প্রেমে পড়েছিলেন। স্বামী জেলে যাওয়ার পর যে ধাক্কা সইতে হলো তাকে, তার ট্রমায় মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। কার্টূনিস্ট কিশোর ভাইয়ের যে কার্টুন শেয়ারের অপরাধে মুশতাক ভাইকে জীবন হারাতে হয় তা ছিল ব্যাংক ডাকাত চৌধুরী নাফিজ সরাফাতকে ব্যঙ্গ করে আঁকা।

উল্লেখ্য, শেখ হাসিনাকে ‘ফুফু’ ডাকা চৌধুরী নাফিজ সরাফাত, তাঁর স্ত্রী আঞ্জুমান আরা শহীদ ও ছেলে চৌধুরী রাহিব সাফওয়ান সরাফতের নামে থাকা সম্পত্তির মধ্যে রয়েছে রাজধানীর গুলশানসহ বিভিন্ন এলাকায় ২২টি ফ্ল্যাট, গুলশান-২ এ ২০ তলাবিশিষ্ট একটি বাড়ি, বসুন্ধরায় সাড়ে সাত কাঠার ওপর চারতলা একটি বাড়ি, পূর্বাচলে সাড়ে সাত কাঠার একটি প্লট, গাজীপুর ও বাড্ডায় মোট ২৫ কাঠা জমি এবং অতিরিক্ত ১৩ কাঠা জমি।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অভিযোগ অনুযায়ী, চৌধুরী নাফিজ সরাফাত প্রতারণা ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে ৮৮৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন, যার ভিত্তিতে আদালত তাঁদের সব স্থাবর সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ দিয়েছেন। সূত্র: কিশোর-মুশতাকের সামনে অসহায় এক সাংবাদিক, গোলাম মোর্তোজা [রোববার মার্চ ৭, ২০২১], ডেইলি স্টার । "একটা কার্টুন শেয়ার করল, সেজন্য মারা গেল জেলে": মুশতাকের ভাই,[ ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২২], bdnews24। প্রথম আলো, দ্য বিজনেস স্ত্যান্ডার্ড।

এই খবর প্রথম প্রকাশ হয়েছিল প্রান্তিক নিউজের ফেসবুক পাতায়।