"ক্ষুধার্ত বাঙালিদের মৃত্যু ততটা গুরুতর নয়, যতটা বলিষ্ঠ গ্রীকদের মৃত্যু হবে"
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ভারতের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সময় আজকের দিনে স্টেটসম্যান পত্রিকা প্রকাশ করে এক হৃদয়বিদারক ছবি, ক্ষুধার্ত মানুষের মৃত্যুমিছিলের ছবি

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ভারতের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সময় আজকের দিনে স্টেটসম্যান পত্রিকা প্রকাশ করে এক হৃদয়বিদারক ছবি—ক্ষুধার্ত মানুষের মৃত্যুমিছিলের ছবি। ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দ, ১৩৫০ বঙ্গাব্দের এই দুর্ভিক্ষ, যা ইতিহাসে “পঞ্চাশের মন্বন্তর” নামে পরিচিত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ ভারতের (বর্তমান বাংলাদেশ ও ভারতের পূর্বাঞ্চল) বাংলায় সংঘটিত এক ভয়াবহ মানবসৃষ্ট বিপর্যয়। এটি কেবল প্রাকৃতিক কারণে হয়নি; মূলত ছিল ব্রিটিশদের নীতিগত অব্যবস্থাপনা ও ঔপনিবেশিক নিষ্ঠুরতার ফল।
১৯৪২ সালে বাংলার গভর্নরের নির্দেশে বিপুল পরিমাণ চাল বাজেয়াপ্ত বা ধ্বংস করা হয়, যাতে জাপানিদের হাতে তা না পৌঁছায়। একই সঙ্গে প্রায় ৪৬,০০০ নৌকা বাজেয়াপ্ত করা হয়, ফলে ভেঙে পড়ে মৎস্যশিল্প। পরে খাদ্য মজুত গ্রামাঞ্চল থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় "অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত" শ্রেণির জন্য—ধনী, শিক্ষিত, এবং যুদ্ধশিল্প ও প্রশাসনে যুক্ত মানুষদের জন্য। এতে গ্রামীণ বাংলার সাধারণ মানুষ অল্প সময়েই তীব্র খাদ্যসংকটে পড়ে।
প্রবল বন্যায় ফসলহানি হলেও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের সরকার এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। বরং উপনিবেশকে নিষেধ করা হয় নিজস্ব অর্থনৈতিক ভান্ডার ও জাহাজ ব্যবহার করে খাদ্য আমদানি করতে। একই সময়ে ভারত থেকে চাল রপ্তানি অব্যাহত থাকে, আর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্যান্য প্রান্ত থেকে উদ্বৃত্ত খাদ্য মজুদ করা হয় ইউরোপীয়দের জন্য। ফলে শুরু হয় মহাদুর্ভিক্ষ। ইতিহাসবিদদের মতে, এটি সম্পূর্ণ মানবসৃষ্ট বিপর্যয়। আনুমানিক ২০ থেকে ৪০ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারান।
উল্লেখযোগ্যভাবে, এর আগেও ১৮৭৩-৭৪ সালে খাদ্যসংকট দেখা দিলেও এ ধরনের গণমৃত্যু হয়নি। চার্চিলের বর্ণবাদী মনোভাব এ সময় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি মন্তব্য করেছিলেন— "ক্ষুধার্ত বাঙালিদের মৃত্যু ততটা গুরুতর নয়, যতটা বলিষ্ঠ গ্রীকদের মৃত্যু হবে।" আরও ঘৃণাভরা ভাষায় তিনি বলেছিলেন— "আমি ভারতীয়দের(ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষদের) ঘৃণা করি। তারা জঘন্য মানুষ, জঘন্য ধর্মের অনুসারী।"
আজকের দিনটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—বঙ্গীয় দুর্ভিক্ষ ছিল কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং ঔপনিবেশিক দমননীতি ও অবহেলার ফলশ্রুতি।
এই খবর প্রথম প্রকাশ হয়েছিল প্রান্তিক নিউজের ফেসবুক পাতায়।

