নাৎসিবাদের সমর্থন ফিলিস্তিনের সংগ্রামের সমাধান কি?

ফিলিস্তিনের মুক্তির সংগ্রাম মূলত একটি উপনিবেশবিরোধী আন্দোলন, যা দশকের পর দশক ধরে জায়নিস্ট-ইহুদি বসতি সম্প্রসারণ, জাতিগত নির্মূল এবং বর্ণবৈষম্যমূলক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করে আসছে। কিন্তু কিছু মুসলিম তরুণ—বিশেষ করে যারা অনলাইনের কট্টর ডানপন্থী বাগাড়ম্বর দ্বারা প্রভাবিত—তাদের মধ্যে একধরনের সমস্যাযুক্ত প্রবণতা দেখা যাচ্ছে: তারা জায়নবাদের বিরোধিতার অজুহাতে নাৎসি মতাদর্শের প্রশংসা করছে।
এটি শুধুমাত্র ঐতিহাসিকভাবে ভুল নয়, বরং ফিলিস্তিনের ন্যায়সঙ্গত প্রতিরোধ আন্দোলনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, কারণ এটি উপনিবেশবাদবিরোধী সংগ্রামকে এমন এক ফ্যাসিবাদের সাথে গুলিয়ে ফেলছে, যার নৃশংসতা থেকেই জায়নবাদের উত্থান সম্ভব হয়েছে। আরও উদ্বেগজনক হলো, এই তরুণেরা বুঝতেই পারছে না যে, নাৎসিবাদ ও জায়নবাদ- উভয়ই জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ব এবং অন্য জনগোষ্ঠীকে উচ্ছেদের মতাদর্শের ওপর দাঁড়িয়ে আছে এবং প্রবলভাবে একে অপরের পরম বন্ধু হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে।
এই বিরোধাভাসগুলো অনুধাবন করা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ নাৎসিবাদকে গৌরবমণ্ডিত করা ফিলিস্তিনের কোনো উপকারে আসে না, বরং ইসরায়েলের প্রচারণার ফাঁদেই পা ফেলা হয় এবং ফিলিস্তিনের জনগণের প্রতি বেঈমানী করা হয়। এই ধরণের বক্তব্য ফিলিস্তিনের জন্য যে তাৎক্ষণিক ক্ষতি বয়ে আনে, তা হলো সম্ভাব্য মিত্রদের দূরে ঠেলে দেওয়া।
বহুদিন ধরেই ফিলিস্তিন আন্দোলন একটি বৈচিত্র্যময় জোটের সমর্থন পেয়ে আসছে—উপনিবেশবিরোধী কর্মী, জায়নবাদের বিরোধী ইহুদিগোষ্ঠী, মুক্তিকামী বামপন্থী আন্দোলন, এবং বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই আন্দোলনের পাশে ছিল। কিন্তু যখন মুসলিম তরুণরা হিটলার বা নাৎসি প্রতীক ব্যবহার করে ইসরায়েলের বিরোধিতা করে, তখন তারা জায়নিস্টদের হাতে সহজ একটা প্রচারমাধ্যম তুলে দেয়। ইসরায়েল তখন সহজেই সমস্ত সমালোচনাকে “ইহুদিবিদ্বেষ” হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের অপরাধ আড়াল করতে পারে।
এই প্রবণতা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষতি করে: এটি ফিলিস্তিনিদের নিজস্ব প্রতিরোধ এর ইতিহাসকে মুছে দেয়। তারা সংগঠিত ধর্মঘট, বয়কট-ডিভেস্টমেন্ট-স্যাংশন (BDS) আন্দোলন, এবং জাতিসংঘে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে প্রতিরোধ করেছে—নাৎসি নস্টালজিয়া দিয়ে নয়। “হিটলার ঠিক ছিল”—এমন স্লোগান ফিলিস্তিনিদের সংগ্রামকে শুধু নৈতিক ও রাজনৈতিক গভীরতা থেকেই বঞ্চিত করে না, তাদের মানুষ হিসেবে সম্মান পাওয়ার লড়াইটাকেই ছোট করে ফেলে।
আরও বড় সমস্যা হলো, কিছু মুসলিম তরুণের মধ্যে এই নাৎসি গৌরবের প্রবণতা আসলে জায়নবাদী ইজরাইলের সেই ফ্যাসিবাদী যুক্তির বিজয়, যা জায়নবাদীরা শুধু মুখেই ঘৃণা করে। নাৎসিরা ইউরোপ থেকে ইহুদিদের নির্মূল করতে চেয়েছিল, আর জায়নিস্টরা ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করে একটি ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়—উভয় আন্দোলনই ভুয়া “বিজ্ঞানসম্মত” জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ব, ভূখণ্ড সম্প্রসারণ এবং যাদের ‘নিম্নমানের’ মনে করা হয় তাদের অমানবিক করে তোলার তত্ত্বে দাঁড়ানো।
নাৎসিরা যেমন বলেছিল Lebensraum (আর্যদের জন্য "জীবনধারণের স্থান"), তেমনি জায়নিস্টরা আজকে বলছে Eretz Yisrael (“গ্রেটার ইসরায়েল”)—উভয়েই একই ধরনের জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করে দখলদারিত্বের স্বপ্ন দেখে। নাৎসিদের বর্বরতার প্রতীক ওয়ারসোর ঘেটোর বর্তমান প্রতিচ্ছবি হচ্ছে গাজা—একটি উন্মুক্ত আকাশের নিচে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কারাগার।
সবচেয়ে বিকৃত বাস্তবতা হলো, ইতিহাসে দেখা যায় নাৎসিদের সঙ্গে জায়নিস্টদের প্রাথমিক সহযোগিতা ছিল— যার সবচেয়ে কুখ্যাত দৃষ্টান্ত হলো ১৯৩৩ সালের Haavara Agreement, যার মাধ্যমে জার্মান ইহুদিদের প্যালেস্টাইনে (পরবর্তীতে মাদাগাস্কার এবং সবশেষে হিটলারের ফাইনাল সল্যুশনে তা উপনীত হয়) পাঠানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়, কারণ জায়নিস্ট ইহুদীবাদী এবং নাৎসিরা- উভয় পক্ষই বিশ্বাস করত ইহুদিদের ইউরোপে থাকার অধিকার নেই।
আজকের ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর আদর্শিক পূর্বসূরি জাভোটিনস্কি ১৯২০-এর দশকে প্রকাশ্যেই ইউরোপীয় ফ্যাসিবাদের প্রশংসা করেছিলেন। আজকের পশ্চিমা কট্টর-ডানপন্থীরা যারা মুসলমানদের ঘৃণা করে, তারা ইসরায়েলকে সমর্থন করে কারণ তারা এটিকে একটি সফল জাতিগত-রাষ্ট্রের মডেল বলে মনে করে, যা স্থানীয় জনগণকে উচ্ছেদ করে সম্প্রসারণবাদীদের আধিপত্য কায়েম করতে পেরেছে। এইসব বিপজ্জনক দ্বিমুখিতা প্রত্যাখ্যান করাই হতে হবে আগামী দিনের পথ।
ইসরায়েলের অপরাধের সমালোচনা করতে হলে—এবং অবশ্যই করতে হবে—তা কখনোই নাৎসিবাদের প্রতি সহানুভূতির মাধ্যমে করা যাবে না। বরং সেই সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত জায়নবাদকে বসতিস্থাপনমূলক উপনিবেশিক প্রকল্প হিসেবে চরিত্র উন্মোচন করা, চলমান নাকবার কথা বলা, এবং দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশের আন্তর্জাতিক আদালতে যে গণহত্যার মামলা চলছে তা সমর্থন করা।
যারা নাৎসি কায়দায় জাতিগত নির্মূলকে প্রশংসা করে আবার সমালোচকদের ‘ইহুদিবিদ্বেষী’ বলে দোষারোপ করে—সেই কট্টর ডানপন্থী জায়নিস্টদের দ্বিচারিতা প্রকাশ করা জরুরি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ফিলিস্তিনের সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে ফিলিস্তিনিদের নিজেদের কণ্ঠ—যারা শুরু থেকেই সাংবাদিকতা, ঘরোয়া সংগঠন, ও আন্তর্জাতিক সংহতির মাধ্যমে লড়াই করে এসেছে—নাৎসি ফ্যাসিবাদের গৌরবগাথা আওড়ে নয়।
ফিলিস্তিনের মুক্তির লড়াই হল সব ধরনের বর্ণবাদ এবং জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের বিরুদ্ধে একটি লড়াই—হোক সেটা নাৎসিবাদের মুখোশে, কিংবা জায়নবাদের ছদ্মবেশে। হিটলারের নাম করে ইসরায়েলের বিরোধিতা করা মানে সেই একই নিপীড়নের যুক্তিকে গ্রহণ করা, যার বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিরা প্রাণপণে লড়ছে। প্রকৃত সংহতি মানে হলো, সকল রকমের ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো—হোক সেটা নাৎসি স্বস্তিকার বিরুদ্ধে, কিংবা ডেভিডের জায়নবাদী তারকার বিপক্ষে।
ন্যায়বিচারের পথ নাৎসিদের ছায়াপথে নয়, বরং গাজার অদম্য প্রতিরোধ, পশ্চিম তীরের পাহাড়, এবং বিশ্বব্যাপী ফিলিস্তিনের মুক্তিকে সামগ্রিক মুক্তির সঙ্গে একাকার করে ফেলা এক গণআন্দোলনের মধ্য দিয়েই নির্মিত হবে।
এই খবর প্রথম প্রকাশ হয়েছিল প্রান্তিক নিউজের ফেসবুক পাতায়।



