১৫% শুল্ক কমার বিনিময়ে বাংলাদেশ ঘুরে উৎসবের কিছুই নেই

যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পণ্যের উপর পাল্টা শুল্ক ৩৫% থেকে কমিয়ে ২০% করেছে, অর্থাৎ ১৫ শতাংশ পয়েন্ট হ্রাস পেয়েছে, যা আজ ১ আগস্ট ২০২৫ থেকে কার্যকর। এর ফলে গড় ১৫% শুল্ক এবং ২০% পাল্টা শুল্ক মিলিয়ে মোট ৩৫% শুল্ক দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করতে হবে। এই হ্রাসকরণ শুধু এমনিতেই আসেনি; বিনিময়ে দিতে হয়েছে গোপন ও প্রকাশিত, স্পর্শকাতর এবং ব্যয়বহুল কিছু সুবিধা।
রপ্তানিকারকদের জন্য স্বল্পমেয়াদি সুবিধা আনলেও, নন-ডিসক্লোজাল চুক্তির গোপন শর্ত এবং অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও জাতীয় স্বার্থ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। চুক্তির খসড়া ফাঁসের অভিযোগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দ্বিতীয় সচিব মুকিতুল হাসানের বিরুদ্ধে অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টে মামলা হয়েছে। এই প্রকাশিত ফাঁস নথি জনগণের জানার অধিকারকে সামনে এনেছে।
ফাঁস নথি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক ছাড়াও বাংলাদেশের করনীতি, নিরাপত্তা, এবং ডিজিটাল বাণিজ্যে হস্তক্ষেপ চায়। শর্তের মধ্যে রয়েছে মার্কিন পণ্য আমদানি বৃদ্ধি, চীনা প্রযুক্তি সীমিতকরণ, সাইবার সিকিউরিটি আইন সংশোধন, এবং ১৩টি মেধাস্বত্ব চুক্তিতে যোগদান। মার্কিন ওষুধ, কৃষি পণ্য, মোটরগাড়ি, এবং মেডিকেল ডিভাইসের শুল্ক ও অশুল্ক বাধা কমানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া, তেল, গ্যাস, বীমা, এবং টেলিযোগাযোগে ১০০% বিদেশি মালিকানার দাবি উঠেছে, যেখানে বাংলাদেশে টেলিযোগাযোগে ৬০-৭০% এবং বীমায় স্থানীয় মালিকানা বাধ্যতামূলক। ৬ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে বাংলাদেশ প্রতি বছর ৭ লাখ টন গম (১৮৫০-২৬০০ কোটি টাকা) এবং অতিরিক্ত ২.২০ লাখ টন (৫৮০-৮২০ কোটি টাকা) আমদানির চুক্তি করেছে, সঙ্গে তুলা, এলএনজি, এবং সামরিক সরঞ্জাম আমদানি বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। চুক্তির পূর্ণ বিবরণ প্রকাশ না হওয়ায় অনেক শর্ত অজানা রয়ে গেছে।
সম্ভাব্য ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি, অর্থনৈতিক স্বাধীনতার উপর চাপ, এবং স্থানীয় শিল্পের ক্ষতি। যুক্তরাষ্ট্র তাদের মালিকানা ও মুনাফা প্রত্যাবাসন সহজ করার দাবি জানিয়েছে, তবে করোনাকালে ডলার সংকটে মেটলাইফ ও শেভরনের মতো কোম্পানির অর্থ আটকে যাওয়া ভবিষ্যতের জন্য সতর্কতার ইঙ্গিত দেয়। ফলে এই শর্তগুলো জোরজবরদস্তিমূলকভাবে জাতীয় স্বার্থের উপর ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
শুল্ক হ্রাসের বিনিময়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস বোয়িং থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ (১০টি ৭৮৭-৯, ১৫টি ৭৩৭ ম্যাক্স) কিনবে বলে ঘোষণা দিয়েছে, যার তালিকামূল্য আনুমানিক ৪.৭৪ বিলিয়ন ডলার (~৫০,০০০ কোটি টাকা)। বিমানের বর্তমান বহরে ২১টি উড়োজাহাজ রয়েছে, গড় লোড ফ্যাক্টর ৬৫-৭০%, অর্থাৎ ৩০-৩৫%(এক তৃতীয়াংশ) আসন খালি থাকে। পাইলট, ক্রু, রক্ষণাবেক্ষণ, এবং অবকাঠামোর ঘাটতি নতুন বিমান পরিচালনাকে চ্যালেঞ্জিং করে তুলেছে। ২০০৮-১৪ সালে কেনা ১০টি বোয়িংয়ের ১.৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ এখনও পরিশোধ চলছে।
নতুন ঋণ বিমানের আর্থিক সক্ষমতার উপর চাপ সৃষ্টি করবে। সরকার শুল্ক হ্রাসকে ‘কূটনৈতিক বিজয়’ দাবি করলেও, এটি যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর আঞ্চলিক কৌশলের অংশ। যুক্তরাষ্ট্র চীনের শুল্ক ১২৫-১৪৫% থেকে ৩০%, ভিয়েতনামের ৪৬% থেকে ২০%, কম্বোডিয়ার ৩৬-৪৯% থেকে ১৯%, এবং বাংলাদেশের ৩৫% থেকে ২০% করেছে। বাংলাদেশে হ্রাস ১৫ শতাংশ পয়েন্ট হলেও, চীন ও কম্বোডিয়ায় শুল্ক রাশ বেশি হয়েছে।
এটি এশিয়ায় ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরির কৌশল, যা চীনকেন্দ্রিক উৎপাদন সরিয়ে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ও বাংলাদেশকে সমান সুযোগ দেয়। ফলে, এটিকে ব্যতিক্রমী অর্জন হিসেবে দাবি করা অতিরঞ্জিত এবং বাস্তব বিশ্লেষণের অভাব প্রকাশ করে। এ নিয়ে উৎসবের কিছুই নেই। একদিকে শুল্ক কমলেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কিছু সিদ্ধান্ত আমদানি-রপ্তানিতে চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। চট্টগ্রাম বন্দরে মাশুল ৪০% বৃদ্ধি বন্দরের বাৎসরিক আয় ১,৫০০ কোটি টাকা বাড়াবে।
বেসরকারি কনটেইনার ডিপোতে মাশুল ৩০-১০০% বৃদ্ধি (১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ থেকে) বছরে ৩০০ কোটি টাকা বাড়তি খরচ ডেকে আনবে। কিন্তু এই মাশুল বৃদ্ধি রপ্তানি খরচ বাড়িয়ে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা কমাবে,ঋণ কমার ফলাফলে ভাগ বসাবে। শুল্ক হ্রাস স্বল্পমেয়াদি সুবিধা দিলেও, গোপন চুক্তি, ব্যয়বহুল আমদানি, এবং অজানা শর্ত দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করছে। হুইসেলব্লোয়ারদের শাস্তির আগে জনগণের জানার অধিকারকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।
সরকারের উচিত বন্দরের মাশুল বৃদ্ধিসহ ব্যয়বহুল সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা, চুক্তির বিবরণ প্রকাশ করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় দায়িত্বশীল নীতি গ্রহণ করা।
এই খবর প্রথম প্রকাশ হয়েছিল প্রান্তিক নিউজের ফেসবুক পাতায়।


