প্রান্তিক নিউজের পাশে, সত্য খবরের সাথে থাকুন।সত্যের সাথে থাকুন।

সহায়তা করুন

শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬
২২ কার্তিক ১৪৩৩

বিচার, ক্ষতিপূরণ ছাড়াই রানা প্লাজা ধসের এক যুগ!

বিচার, ক্ষতিপূরণ ছাড়াই রানা প্লাজা ধসের এক যুগ!

আজ রানা প্লাজা ধসের এক যুগ পূর্ণ হলো। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল, সাভারের ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশের নয়তলা ভবন রানা প্লাজা ভবনের পোশাক কারখানায় প্রতিদিনের মতো সেদিন সকাল ৮টায় হাজির হন শ্রমিকরা। কাজ শুরুর দেড় ঘণ্টা পর, সাড়ে ৯টায় ধসে পড়ে ভবনটি। মূহূর্তেই মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয় ভবনটি। কাঠামোগত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়ে মারা যান ১১৩৬ জন। আহত হন আরও কয়েক হাজার, যাঁদের অনেকেই আজ পঙ্গু বা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। কেটে গেছে এক যুগ। এখনো শেষ হয়নি বিচার।

অধিকাংশ ক্ষতিগ্রস্ত পাননি উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ। রানা প্লাজা ধসে শ্রমিক হত্যার ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় ৫৯৪ জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র ৯৩ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়েছে। মামলা এখনো ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন। রাষ্ট্রপক্ষ বলছে, তারা বিচার দ্রুত শেষ করতে সচেষ্ট, কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। ভুক্তভোগী মাসুদা খাতুনের কণ্ঠে ফুটে ওঠে হতাশা—“বিচার পাওয়ার আশায় আমাদের এক যুগ কেটে গেল। কিন্তু বিচার পেলাম না। যাঁদের কারণে এত শ্রমিক খুন হলেন, তাঁদের কারও শাস্তি হলো না।”

মামলার অগ্রগতিতে বড় বাধা ছিল উচ্চ আদালতের একাধিক স্থগিতাদেশ। ২০১৬ সালে অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার পর অভিযোগ গঠন হয় আরও এক বছর পরে। এরপর কয়েকজন আসামি অভিযোগ চ্যালেঞ্জ করে আদালতে গেলে সাক্ষ্যগ্রহণ বন্ধ থাকে প্রায় পাঁচ বছর। ২০২২ সালে আবার শুরু হয় সাক্ষ্যগ্রহণ। বর্তমানে মামলার ৩৮ জন আসামির মধ্যে একমাত্র ভবন মালিক সোহেল রানা রয়েছেন কারাগারে। তিনজন আসামি মারা গেছেন। মামলার প্রক্রিয়াগত ধীরগতিকে ‘অনিচ্ছা’ ও ‘পূর্ব সরকারের আন্তরিকতার অভাব’ বলেই মনে করেন শ্রমিকনেত্রী কল্পনা আক্তার।

রানা প্লাজা ধসে যাওয়ার পেছনে ছিল নির্মাণে ত্রুটি, নকশা না মানা, এবং নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার। এ কারণে ২০১৫ সালে সোহেল রানাসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় সিআইডি। কিন্তু এখানেও উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ এসে সাক্ষ্যগ্রহণ আটকে দিয়েছে। রাজউক ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা এখনো বিচারাধীন। রানা প্লাজার ঘটনায় অনেক শ্রমিক এখনও ক্ষতিপূরণ পাননি। ক্ষতিপূরণে লস অব আর্নিংয়ের (আয়হানি) ভিত্তিতে যে অর্থপ্রদান হওয়ার কথা, তা বাস্তবে হয়নি বলেই দাবি শ্রমিক সংগঠনগুলোর।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি রফিকুল ইসলাম সুজন বলেন,“প্রতি বছর এই দিনে আমরা দাবি জানাই—ক্ষতিপূরণ দিন, বিচার দিন। সরকার সোহেল রানার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছে, কিন্তু তা এখনও শ্রমিকদের মাঝে বিতরণ হয়নি।” তাঁর দাবি, ২৪ এপ্রিলকে জাতীয় শোক দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হোক। এই দিনে হাজারের বেশি শ্রমিকের মৃত্যু শুধু একটি ট্র্যাজেডি নয়, এটি বাংলাদেশের পোশাক খাতের সঙ্কটের প্রতীক। ভবনটি ধসের ২৪ ঘণ্টা আগে থেকেই তাতে ফাটল দেখা দিয়েছিল।

শ্রমিকরা তখন কর্মস্থল ত্যাগ করে নিরাপদ স্থানে চলে যান। কিন্তু প্রশাসনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা আশ্বস্ত করেছিলেন—“এটা বড় কিছু নয়।” পরদিন সকালে উৎপাদন শুরু হতেই ধসে পড়ে রানা প্লাজা। সেদিন পদক্ষেপ নিলে হয়তো বাঁচানো যেত শত শত জীবন। রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপ এখন আর নেই, তবে কংক্রিটের ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে আছে জায়গায় জায়গায়। তৈরি হয়েছে শহীদ বেদি—‘প্রতিবাদ-প্রতিরোধ’। এখানে এসে আজও কাঁদেন স্বজনহারা মানুষ, আন্দোলনে শামিল হন শ্রমিকরা।

সোহেল রানার মালিকানাধীন সব জমি এখন সরকারের দখলে। অধরচন্দ্র স্কুল মাঠ যেখানে দিনের পর দিন চলেছে লাশ শনাক্ত আর হস্তান্তরের প্রক্রিয়া, সেই মাঠে এখনও শোকের প্রতিচ্ছবি।

এই খবর প্রথম প্রকাশ হয়েছিল প্রান্তিক নিউজের ফেসবুক পাতায়।