প্রান্তিক নিউজের পাশে, সত্য খবরের সাথে থাকুন।সত্যের সাথে থাকুন।

সহায়তা করুন

শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬
২২ কার্তিক ১৪৩৩

তিন দশকে দেশে ফিরেছে ৫৬,৭৬৯ প্রবাসী শ্রমিকের মরদেহ

ভবিষ্যতের আশায়, পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর তাগিদে, প্রতি বছর হাজার হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক পাড়ি জমান বিদেশের পথে

ফটোকার্ড: তিন দশকে দেশে ফিরেছে ৫৬,৭৬৯ প্রবাসী শ্রমিকের মরদেহ

ভবিষ্যতের আশায়, পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর তাগিদে—প্রতি বছর হাজার হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক পাড়ি জমান বিদেশের পথে। কারও হাতে থাকে মা-বাবার ঔষধের খরচ, কারও চোখে সন্তানের পড়াশোনার স্বপ্ন। কিন্তু অনেকের সেই যাত্রার শেষ গন্তব্য হয়ে ওঠে কাফনে মোড়া নিথর দেহ, দেশের মাটিতে ফেরার বুকভাঙা গল্প। ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ডের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালে দেশে ফিরেছে ৪ হাজার ৮১৩ প্রবাসী কর্মীর মরদেহ—এটাই এক বছরে সর্বোচ্চ সংখ্যা। ২০২৩ সালে এই সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৫৫২।

এর আগের বছরগুলোতেও সংখ্যাটি ছিল উদ্বেগজনক। ২০২১ সালে দেশে ফিরেছিল ৩ হাজার ৮১৮ এবং ২০২২ সালে ৩ হাজার ৯০৪ জন প্রবাসী কর্মীর মরদেহ। অর্থাৎ প্রতি বছরই গড়ে প্রায় ৪ হাজার পরিবারের স্বপ্নভঙ্গের খবর এসে পৌঁছায় দেশের মাটিতে। ওয়েজ আর্নার্স বোর্ডের ওয়েবসাইটে গত ১৪ জানুয়ারি প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশে ফিরেছে মোট ৫৬ হাজার ৭৬৯ প্রবাসী শ্রমিকের মরদেহ। পরিসংখ্যানে আলাদা করে উল্লেখ করা হয়নি কোন দেশ থেকে কতজনের মরদেহ ফিরেছে।

তবে পূর্ববর্তী বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই ২০১৬ থেকে জুন ২০২২ পর্যন্ত দেশে এসেছে ১৭ হাজার ৮৭১ জনের মরদেহ, যার ৬৭ দশমিক ৪ শতাংশই এসেছে উপসাগরীয় ছয় দেশ—সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, কুয়েত, কাতার ও বাহরাইন থেকে। এই সময়ের মধ্যে শুধু সৌদি আরব থেকেই ফিরেছে ৫ হাজার ৬৬৬ জনের মরদেহ। সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ১ হাজার ৯১৩ ও ওমান থেকে ফিরেছে ১ হাজার ৮৯৩ মরদেহ।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্যমতে, ১৯৭৬ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ বাংলাদেশি কর্মী বিদেশে গেছেন। তাদের মধ্যে ৭৬ দশমিক ৩ শতাংশই গেছেন উপসাগরীয় দেশগুলোতে। বিদেশে অনেক শ্রমিক অল্প বয়সে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কঠোর পরিশ্রম করেন। নিম্নমানের আবাসন, অনিরাপদ কর্মপরিবেশ, অতিরিক্ত কাজের চাপ, অপর্যাপ্ত পুষ্টি এবং মানসিক চাপ—সব মিলিয়ে অনেকেই দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা কিংবা হঠাৎ মৃত্যুর শিকার হন।

তবে এই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ অধিকাংশ সময় পরিসংখ্যানে স্পষ্টভাবে উঠে আসে না। “হার্ট অ্যাটাক” শব্দটি প্রায়শই মৃত্যুসনদে সাধারণভাবে লেখা থাকে। প্রবাসীদের কল্যাণে ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ড প্রতিটি মরদেহ পরিবহনের জন্য ৩৫ হাজার টাকা এবং ক্ষতিপূরণ হিসেবে আরও ৩ লাখ টাকা দিয়ে থাকে। তবে এই আর্থিক সহায়তা জীবন রক্ষার বিকল্প হতে পারে না। প্রবাসীদের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা এবং ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত না করা পর্যন্ত এই মৃত্যুর মিছিল থামবে না।

মে দিবসে, যখন বিশ্বজুড়ে শ্রমিকদের অধিকার ও মর্যাদার কথা বলা হয়, তখন আমাদেরও ফিরে তাকানো দরকার সেই প্রবাসী শ্রমিকদের দিকে—যারা দেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় অবদান রেখে যাচ্ছেন, অনেকেই জীবনের বিনিময়ে।

এই খবর প্রথম প্রকাশ হয়েছিল প্রান্তিক নিউজের ফেসবুক পাতায়।