একই খেলার দুই মৃত্যু: একটিতে বিশ্ব থেমে কাঁদে, আরেকটিতে পাথরের মতো নীরবতা
একই খেলার দুই মৃত্যু, কিন্তু একটিতে বিশ্ব থেমে কাঁদে, আরেকটিতে পাথরের মতো নীরবতা

একই খেলার দুই মৃত্যু— কিন্তু একটিতে বিশ্ব থেমে কাঁদে, আরেকটিতে পাথরের মতো নীরবতা। দিয়াগো জোতা ছিলেন পর্তুগালের জাতীয় দলের ফুটবলার এবং ক্লাব ফুটবলে লিভারপুলের প্রাণ। আকস্মিক এক সড়ক দুর্ঘটনায় তার মৃত্যুতে বিশ্বজুড়ে নামে শোকের ঢল। ক্লাব, ফেডারেশন, সতীর্থ, দর্শক সবাই তাঁকে স্মরণ করেছে, কেঁদেছে। ফিফা ও উয়েফাও শ্রদ্ধা জানিয়েছে। এটি একটি ন্যায্য শোক, তাতে কোনো দ্বিধা নেই।
কিন্তু একই সময়ে ফিলিস্তিন জাতীয় দলের ফুটবলার এবং আল-মাঘাজি সার্ভিসেস ক্লাবের অধিনায়ক মুহান্নাদ ফাদল আল-লিলি নিহত হন ইসরায়েলি বিমান হামলায়। কোনো দুর্ঘটনা নয় বরং এটি এক পরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় সহিংসতার শিকার হওয়া একজন ফুটবলারের মৃত্যু। কিন্তু তিনি এই চলমান গণহত্যায় নিহত প্রথম ফিলিস্তিনি ফুটবলার নন, অন্তত ২৬৫তম ফিলিস্তিনি ফুটবলার। অথচ, তাঁর মৃত্যু নিয়ে কোথাও কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। নেই শোকবার্তা, নেই মৌনতা। ফিফা বা উয়েফার একটিও বিবৃতি নেই। বিশ্ব মিডিয়াও নীরব।
ফুটবল গণমানুষের খেলা হিসেবে প্রাসঙ্গিক থাকায় এটি কখনোই রাজনীতির বাইরে ছিল না। ইউরোপ থেকে ছড়িয়ে পড়লেও আজও ফুটবলের কেন্দ্র ইউরোপেই আবর্তিত। খেলা চললেও খেলার বাইরে কে ‘মানুষ’, কে ‘শত্রু’ সেই বৈষম্যের নিয়ন্ত্রণও সেই কেন্দ্র থেকেই হয়। শুধু মাঠ নয়, খবরের শিরোনাম, শোক প্রকাশ, প্রতিক্রিয়া- সবই যেন এক সাম্রাজ্যিক চিত্রনাট্যের অনুসারী। ইউরোপে ফিলিস্তিনের পক্ষে মাঠে কেউ পতাকা তুললেই জরিমান অথবা শাস্তি, কিন্তু ইউক্রেনের পক্ষে দাঁড়ানো যায় অবলীলায়।
যে ফুটবল খেলা মানবিক সংহতির জায়গা হয়ে উঠতে পারত, সেখানে আজ স্পন্সর ও সামরিক পৃষ্ঠপোষকতায় জায়গা করে নিচ্ছে যুদ্ধের কুশীলবরা। এর বাস্তব উদাহরণ আমরা দেখলাম দিয়াগো জোতা ও মুহান্নাদ ফাদল আল-লিলির মৃত্যুর প্রেক্ষাপটে। এই নীরবতা নিছক উদাসীনতা নয়, বরং এটি এক পরিকল্পিত পক্ষপাত। যেখানে শোকও শ্রেণী, বর্ণ, ভূগোল ও রাজনীতির দ্বারা নির্ধারিত।
দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদের বিরুদ্ধে যেভাবে ক্রীড়াবিশ্ব অবস্থান নিয়েছিল, ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হতেই যেভাবে রাশিয়ার ক্লাব ও খেলোয়াড়দের নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, এ সবই তার প্রমাণ। তাহলে ফিলিস্তিনের ক্ষেত্রে এই নীরবতা কেন? ফিলিস্তিনের ফুটবলাররা কি মানবিক মর্যাদার আওতার বাইরে? আসলে, গণমানুষের খেলা ফুটবল মাঠের বাইরেও নানান খেলার অংশ, যাকে পকেটে ফুরে নিচ্ছে কর্পোরেট ও সাম্রাজ্যিক শক্তির অংশগুলো।
অস্ত্র শিল্পের দৌরাত্ম্যে অর্থনীতি সচল রাখতে যে যুদ্ধ প্রয়োজন তা ইউরোপের শাসকগোষ্ঠী ভালো করেই জানেন এবং মানেন। ফলে সেটা টিকিয়ে রাখতে কিভাবে সংস্কৃতি ও খেলাধুলাকে ব্যবহার করা হচ্ছে তা স্পষ্ট। ফলে, ইউরোপের ইউরোপ-আমেরিকার খেলোয়াড়েরা "মানুষ", আর গাজার খেলোয়াড়রা যেন শুধুই এক পরিসংখ্যান হয়ে রয়। মুহান্নাদ আল-লিলির মৃত্যু তাই শুধু একজন খেলোয়াড়ের মৃত্যু নয়, এটি এক জাতির আত্মপরিচয়ের বিরুদ্ধে আঘাত। কারণ দখলদাররা জানে—খেলাধুলাও হতে পারে প্রতিরোধের ভাষা।
একজন ইউরোপীয় ফুটবলারের মৃত্যুতে গোটা দুনিয়া থেমে যায়, অথচ একজন ফিলিস্তিনি খেলোয়াড়ের মৃত্যু যেন অপ্রাসঙ্গিক। এই বৈষম্য আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় যে, শোকও এক রাজনৈতিক অস্ত্র। আজ যদি আমরা মুহান্নাদ আল-লিলির জন্য এক মিনিট নীরবতা চাই, তা হবে না শুধুই শ্রদ্ধা। বরং তা হবে অন্য এক মানবিক অবস্থানের ঘোষণা, এক ন্যায়বোধের প্রতিরোধ—যা বলবে: সব মৃত্যুই শোকের দাবি রাখে, সব জীবনই সমান মর্যাদার।
এই খবর প্রথম প্রকাশ হয়েছিল প্রান্তিক নিউজের ফেসবুক পাতায়।





